বিষণ্ণতা ও তার প্রতিকার

0
2297

আমরা প্রায় সবাই সারাদিন ভীষণ ব্যস্ত থাকি। অনেক দৌড়ের উপর থাকি, আমাদের জীবন থেকে হয়ত কাকডাকা শান্ত ভোর, নিস্তরঙ্গ নির্জন দুপুর অথবা অলস বিকেলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আছে শুধু হুলস্থূল, দৌড়, ব্যস্ততা। সকালে উঠেই অফিসে দৌড়, স্কুল/কলেজ/ভার্সিটিতে দৌড়, রান্নাঘরে দৌড়, শপিং এ দৌড়, বাচ্চার পিছনে দৌড়, কেবল দৌড় আর দৌড়।

 

সারাদিন কাজের চাপে নাভিশ্বাস অবস্থা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে জমতে থাকে ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা, স্ট্রেস। সেই স্ট্রেসের বোঝা হালকা করার কোন সুযোগ নেই, পরদিন আবার জীবনের নিরন্তর প্রতিযোগীতায় নেমে পড়া। এভাবে চলতে চলতে জীবনে নেমে আসে হতাশা,  কখনো মনে হয় চারদিক থেকে ঘিরে ধরা অবসন্নতার অন্ধকার ঠেলে আর বোধহয় এগুনো যাচ্ছে না। শুরু হয় বিষন্নতা বা ডিপ্রেশন এর মতো মানসিক সমস্যা।

 

বিষণ্ণতা হলো ইমোশনাল ইলনেস এবং এ রোগে ব্যক্তির মন-মেজাজ বা মুডের অবনতি ঘটে দারুণভাবে। মানসিক রোগের মধ্যে সর্বাধিক কমন রোগ বিষণ্ণতা। এটি এমন এক রোগ যার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে উদ্বিগ্নতা এবং বাধ্যতাধর্মী গোলযোগ। তবে উদ্বিগ্নতা এবং বাধ্যতাধর্মী গোলযোগ আলাদাভাবেও রোগের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। যারা উদ্বিগ্নতায় সচরাচরভাবে ভুগতে থাকে তাদের মাঝেও বিষণ্ণতা অনেক সময় দেখা দেয়। বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে বিভিন্ন মাত্রায়, গভীরতায় ও পরিসরে। এ রোগটি প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন দুর্বিষহ ও অর্থহীন করে ফেলে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভেঙে পড়েন, অলস হয়ে যান, হয়ে যান অকর্মঠ, নিস্তেজ, শক্তিহীন ও অ্যানার্জিহীন।

মানবদেহ তো যন্ত্র নয়। আমাদের কর্মদক্ষতা ও সফলতা নির্ভর করে শরীর এবং মন কতটা সুন্দরভাবে মিলে মিশে কাজ করছে তার উপর। শারীরিক অসুস্থতার ছাপ যেমন সব কিছুর উপর প্রভাব ফেলে, তেমনি মানসিক ক্লান্তি, অবসাদ দেহের গতি থামিয়ে দেয়। তাই রোজকার এই ক্লান্তি, ভাল না লাগা, বিষণ্ণতা আর স্ট্রেসকে সামান্য বলে উড়িয়ে দেবেন না। মনের বরাদ্দ খোরাকটুকু মনকে দিন- অভ্যাস গুলোতে ছোট ছোট পরিবর্তন এনে চেষ্টা করুন দিনগুলোকে একটু স্ট্রেস ফ্রি রাখার, মন কে দিন প্রশান্তি। শুধু কয়েকটা দিন করে দেখুন, নিজের নতুন উদ্যম আর আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হবেন আপনিও।

 

একবার ভাবুন, এই যে এতো সুন্দর পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, আলো, বাতাস কত কি ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশে। শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, পরিবার পরিজন নিয়ে সৃষ্টিকর্তার অনাবিল করুনায় ভালই তো আছি। তবুও কেন এই বিষন্নতা?? সুরা “আর-রাহমানে” মহান আল্লাহতালা  বলেছেন, “তোমরা আমার কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?” ঠিক এমনি ভাবেই প্রতিটা ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার অপার নিয়ামতের কথা বর্ণনা করা আছে। তবুও আমরা বিষন্নতায় ভুগি।  কারনে অকারনে ভুগি। যে কোন বিষন্নতাকে অবহেলা করবেন না। কারন বিষণ্ণতা থেকেই সৃষ্টি হয় আরো নানা ধরনের মানসিক জটিলতা। একটু চেষ্টা করলেই আমরা ছোট খাট জটিলতা গুলো, প্রাথমিক বিষণ্ণতার কারণ গুলো থেকে বের হতে পারি।

 

আসুন জেনে নিই বিষন্নতা থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছু ছোট্ট টিপস-

১. রাতে পর্যাপ্ত ঘুমান, ৭/৮ ঘন্টা।

২. রোজ মিনিমাম ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করুন।

৩. গভীরভাবে শ্বাস নিন, এবং ছাড়ুন।

৪. মেডিটেশন করুন।

৫. হাসিখুশী থাকুন।

৬. ঠিক কোন কোন বিষয়গুলো আপনার বিষন্নতা বাড়াচ্ছে তা চিহ্নিত করুন। এবং তা কমানোর জন্য একটা খসড়া প্ল্যান করুন।

৭. গুছিয়ে রাখুন নিজের চারপাশ। নিজের কাজগুলো নিজে করুন। অন্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনুন।

৮. সারাদিনের কাজগুলো প্ল্যান করে নিন।

 

৯. নিজের ভাল থাকা মন্দ থাকাকে অন্যের হাতে তুলে দিবেন না।

১০. মমতা, ভালবাসা, ভাললাগা আর কৃতজ্ঞতার অনুভূতিগুলোকে লালন করুন।

 

১১. নিজের আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য কে বিকশিত করার সুযোগ করে দিন।

 

১২. এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিজ কে কাজে লাগান।

১৩. স্বাস্থ্যকর খাবার অভ্যাস করুন।

১৪. শিশুদের সাথে খেলুন।

১৫. প্রতিদিন কিছুটা সময় নীরবতা পালন করুন। নিজের সাথে কথা বলুন, নিজেকে সময় দিন, নিজেকে বুঝুন।

১৬. আকাশকুসুম ভাববেন না, নিজের কাজের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

১৭. পরিবার বা প্রিয়জনের সাথে সময় কাটান। সুখ দুঃখ শেয়ার করুন।

১৮. কাজের ফাঁকে নিয়মিত অবকাশ যাপন করুন।

১৯.নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিন। যখন বিষন্নতার লাগাম থাকবে আপনার হাতের মুঠোয়, চলার পথে ছোটখাটো হোঁচট খেলেও আপনি আর ঘাবড়ে যাবেন না- দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলবেন শুধুই সামনে।

 

২০. কি নেই আপনার, কি পেতে পারতেন, কি পাওয়া হলো না, সেটা না ভেবে কি আছে আপনার, কতটা ভাল আছেন সেটা নিয়ে ভাবুন, সেটা নিয়ে ভাল থাকুন।

শুভ কামনা সবার সুন্দর, সুস্থ আর প্রাণবন্ত জীবনের জন্য।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

পাঠকের মতামতঃ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here