Mashroof Hossain

0
2920

আমার ফিটনেস গুরু: আমার আম্মু

“লোকে বলে বয়েস বাড়ে আমি বলি কমে”

লালনের একটা গান আছে, যার আক্ষরিক অনুবাদ যদি মাথায় নিই তাহলে উদাহরণ হিসেবে সবার প্রথমে আসবে আমার আম্মুর কথা। এই যে ফিজিকাল ফিটনেস নিয়ে এত মাতামাতি করি, এর মূলে রয়েছেন আম্মু।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে পাস করার পর তিনি তাঁর জীবনের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য অংশটুকু ব্যয় করেছেন আমার আর আমার ছোট বোনের পেছনে। আমরা একটু বড় হবার পর তিনি ঠিক করলেন, এবার নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটা যাক!

আম্মুর ওজন ছিলো সাতানব্বই কেজি। বোন জন্মানোর পর সেই যে শরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, সেটা অনেকদিন রাশ টেনে ধরতে পারেননি। রাঁধতে ভালবাসতেন খুব(এখনো বাসেন), বাসায় প্রায় প্রতিদিন রান্না হত মজার মজার সব খাবার। আম্মুর স্পেশালিটি ছিল সব মিষ্টি জিনিস। বান্দরবান শহরে সব অফিসাররা দল বেঁধে আমাদের বাসায় আসতেন পায়েস, দুধ লাউ, চকলেট কেক, দুধ চিতই পিঠা খেতে। এছাড়া প্রতি মাসেই করতেন। এই অফিসারদের অনেকেই পরবর্তীতে সচিব, মেজর জেনারেল ইত্যাদি পদে উন্নীত হয়ে রিটায়ারও করেছেন। মাঝে মাঝে রিইউনিয়নে দেখা হলে বলে ওঠেন- ভাবী, এখনো কি পায়েস বানান? আমি আর আমার স্ত্রী আগামী শুক্রবার বাসায় আসি?

বুঝতেই পারছেন খাওয়া দাওয়া আমাদের বাসায় উৎসবের মত ছিল। এটা করে যা হল, শরীর বিদ্রোহ করা শুরু করল। দেখা দিল প্রচন্ড কোমর ব্যথা। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিলেন, যদি ওজন কমাতে না পারেন এই ব্যথা বাড়তে থাকবে- এক সময় হাঁটা চলাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আব্বুর তখন চট্টগ্রাম পোস্টিং। নন্দন কানন ফরেস্ট হিলে পাহাড়ের উপর আমাদের বাসা ছিল, সেখানে আম্মু প্রতিদিন হাঁটা শুরু করলেন। সেই সাথে খাবার তালিকা থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় হল বেশিরভাগ মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য ও সরল কার্বোহাইড্রেট। হাঁটার সাথে সাথে শুরু হল ব্যায়াম, চট্টগ্রামের একটা জিমে নিয়মিত যাওয়া আসা করতে লাগলেন। এভাবে ছয় মাসে আটাশ কেজি ওজন কমার পর সেখানেই ইন্সট্রাক্টর হিসেবে যোগ দিলেন।

পরবর্তীতে আমরা ঢাকা চলে আসি, আমি ভর্তি হই বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছোট বোনটা স্কুলে। আম্মুর জিমে যাওয়া থেমে থাকেনা। আমাদের পরিবারের উপর নানারকম বিপদ আসে, তাতেও তিনি জিমে যাওয়া বন্ধ করেননি। ঢাকার নানা জিমে কাজ করেছেন ইন্সট্রাকটর হিসেবে।

“যত বিপদ আসুক না কেন, কখনোই আমি ব্যায়াম করা থামাইনি। আমি জানি, যত আমি বসে থাকব ততই হতাশা আমাকে এসে গ্রাস করবে, জীবন থেকে ছিটকে পড়ব। ঝড় ঝাপ্টা যাই আসুক, ব্যায়াম আমাকে দু পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে সহায়তা করে। এটা আমি ছাড়বো না”

এভাবে বিভিন্ন জিমে কাজ করতে করতে আম্মুর মনে হল, নিজেই একটা জিম দেইনা কেন? এই চিন্তা থেকে দুহাজার পাঁচ সালের পাঁচ ফেব্রুয়ারি মাত্র চারজন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় “মেঘনা’স ফিটনেস সেন্টার” এর। গত বারো বছরে চারজন থেকে ছাত্রীসংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বহু আগেই। আমার এ প্রোফাইলেও আম্মুর অনেক ছাত্রী আছেন, যাঁরা আমার পরিচয় জানেন “মেঘনা আন্টির ছেলে” হিসেবে।

” আপনার বয়েস বায়ান্ন হয়ে গিয়েছে, এই বয়েসে এত কষ্ট করে কি লাভ?”

অনেকেই এ প্রশ্ন করেন আম্মুকে।

“নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে আমার জীবনের প্রথম চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর কেটে গিয়েছে। ছেলে মেয়ে মানুষ করেছি, বাড়ি বানিয়েছি মাথা গোঁজার, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছি। আমি মনে করি এখন আমার সময় হয়েছে নিজের মত করে এ পৃথিবীটাকে দেখার। আমি চাইনা কারো উপর নির্ভর করতে, যে কদিন পৃথিবীতে আছি এর রূপ রস গন্ধ আমি দেখতে চাই। ফিজিকাল ফিটনেস আমাকে এটা করতে দেয়। এর মাধ্যমে আমি আত্মনির্ভরশীল হয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি, নিজের সাথে সাথে আমার ছাত্রীদের জীবন পাল্টাতে সহায়তা করেছি”

“যে মানুষটা নিজের শরীরের যত্ন নেয়না, নিজের শরীর যে ঠিক রাখেনা, সে কিভাবে সমাজ বা দেশের যত্ন নেবে? নিজের আপনজনকেই বা আগলে রাখবে কিভাবে? ফিজিকাল ফিটনেস কোন বিলাসিতা নয়, জীবন ধারণ করতে হলে এর কোন বিকল্প নেই”।

“ফিটনেস ধরে রাখতে সবচাইতে বড় বাধা অনুপ্রেরণা ধরে রাখা। এ কাজটিই আমি করি, এবং বাকি জীবন করে যেতে চাই। আমি চাই মানুষ ফিট হোক, নিজের জীবনকে হতাশার হাত থেকে উদ্ধার করুক। আমার ছাত্রীদের মাধ্যমে সমাজে এটাই আমার সামান্য অবদান”

যে ছবিটা দেখছেন তার উপরেরটা ১৯৯২ সালের, আর নীচেরটা ২০১৭ সালের। দুটো ছবিতেই বাম পাশে আম্মু, ডান পাশে আমি।

প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, আমার বায়ান্ন বছর বয়েসি মা যদি এখনও ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, আপনি পারবেননা কেন?

শুরু করুন এই আজ থেকেই!

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
3

পাঠকের মতামতঃ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here