Foysal Ahamed

0
1082

২০১২ – ডায়েট শুরু। ১ সপ্তাহ পর শেষ। গায়ে জ্বর দেখে আম্মু আর ডায়েট করতে দেই নাই।
২০১৩ – জিমে যাই ১৫ দিন করার পর সালাম দিয়ে বের হয়ে আসি।
২০১৪ – মুখের রুচি অত্যাধিক বেরে যায়। ১০০ কেজি থেকে ১২০ কেজি তে যাই এই বছরে।
২০১৫ – ডিসেম্বর । আবার জিমে যাই, এইবার ১ মাসে জিমের পার্ট শেষ করি।
২০১৬ – ফেব্রুয়ারী। আবার জিমে যাই, যথারীতি ১ সপ্তাহ, তারপর সেই আগের মতই আমি।
১২ই মার্চ ২০১৬ – আবার ডায়েট শুরু। এবং তার পর থেকে আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে আমার পথ চলা…
দেখতে দেখতে ৪ বছর। মনে হচ্ছে ঘুমের মধ্যেই সব হয়ে গেলো। শুরুটা শুরু হয়েছিলো কিছু অপ্রিয় সত্য দিয়ে। আমি সব সময় আমার নিন্দুকেই ভালোবাসি ( সাহিত্য ), জীবনের চলার পথে সাহিত্য দরকার আছে। আপনকে যে ভালবাসে, যে আপনার কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তারা কখনই আপনার ভুল ত্রুটি ধরবে না। তাই আপনাকে ত্রুটি মুক্ত করতে চাইলে অবশ্যই নিন্দুকের শরণাপন্ন হতেই হবে।
আমি বার বার এই কাজটাই করেছি। তাই ত্রুটি গুলোও বের করেছি দ্রুত। এই পোস্ট হয়তো সবার কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কেও নেকামি ভাবতে পারে। কেও ভাবতে পারে দেখানোর জন্য। ভাবাভাবি তাদের কাছেই থাক, পারলে এড়িয়ে চলে যান। আমি জানিনা এই পোষ্ট আপনাদের ( যারা ওভার ওয়েট ) সামন্য মটিভ্যাট করতে পারবে কিনা। যদি পারে তাহলে আমার লেখাটা সার্থক। এখানে আমি তাই লিখবো যা ১২ মার্চ ২০১৬ থেকে এখন পর্যন্ত হয়েছে। তাহলে শুরু করা যাক।
আমি পাপুয়া নিউ গিনি থাকা অবস্থায় আমার সকালের নাস্তা ছিলো ১ টা ৩০০ এমএল কোকাকোলা সাথে স্কচ ফিঙ্গার সকাল ৭টায়। তারপর ১০ টায় ৪টা ডিম সাথে ভাত ( মিনিমাম দের প্লেট) অথবা রুটি। দুপুরে ভাত সাথে বীফ, ডিম, বিকালে বাসায় যাওয়ার আগে আবার কোকাকলা। তারপর রাত আবার সেই ভারি খাবার ( এভাবে ওজন ১২০ কিলো হয়েছিলো ২০১৪-২০১৫) । প্রতিদিন এভাবেই চলত ১ বছর টানা। দিনে মিনিমাম ৪টা ৩০০ এমএল কোক পান করা হত। তারপর দেশে আসি ২০১৫ এর শেষের দিকে। তখন আমার বিয়ের কথা চলছে। মেয়ে দেখা হলো সব মোটামুটি ভালই হচ্ছে, কিন্তু মেয়ের বাড়ির কিছু লোক আমাকে আড় চোখে দেখতে শুরু করলো। যেনো আমি চোর। মনের মধ্যে আঘাত পেলাম খুব। যাই হক, তারপরেও তারা আত্মীয়তা করতে রাজি ছিলো, কিন্তু আমার এবং আমার বড় আপুর দুজনকেই ব্যাপারটা খুব আঘাত করলো বিধায় সব বন্ধ।
আমি মোটামুটি এলাকায় খুব পরিচিত এক নামে চিনতো ( আঞ্চলিক ভাষায় বোটকা ফয়সাল হিসাবে )। রাস্তা দিয়ে বের হলেই সবাই এক অন্যরকম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতো, তাদের ভাব দেখে মনে হত আমি এলিয়েন। বন্ধু যারা ছিলো ( খুব কাছের বন্ধুও, বেস্ট ফ্রেন্ড ) তারাও কম যেতো না। নিজের বাপের খাই, নিজের বাপ মা কিছু বলেনা। অথচ বাহিরের মানুষ এর অনেক টেনশন ছিলো আমাকে নিয়ে। তিনটি কারন আমার মনের মধ্যে খুব বাজে ভাবে আঘাত করে তার মধ্যে একটি সেই বিয়ে, দুই এক দোকান ওয়ালা যার দোকানের সামনের দিয়ে আমাকে প্রায় যাতায়াত করতে হত, আর তিন আমার বন্ধু ( বেস্ট ফ্রেন্ড) বলেছিলো, আমি জীবনেও আমার ওজন কমাতে পারবোনা। অবাক করা বিষয় সেই বন্ধুর শার্ট কিংবা প্যান্ট এখন আমার বড় হয়। তার ওজন ৭৬-৭৮ কিলো আমার ৭৩.৫-৭৪.৫/৭৫। আমার বন্ধুটির অবস্থা এমন হয়েছে এখন যে সে তার স্ত্রীর জন্য আমার কাছে টিপস চায়। তবে সেই বন্ধু সেই দিনের পর থেকে আমার ওজন নিয়ে আর কথা বলে নাই। সেই দোকানদারও এখন আমি যাওয়ার সময় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে এলাকার মানুষ গুলো এখনো তাকায় তবে সেই আগের দৃষ্টি তে না। যারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো তারা এখন টিপস নিতে আসে। আমিও আনন্দের সাথে দেই, দিতে ভালো লাগে।
যাই হোক, আমি একটা গল্প পরেছিলাম। ঈগল পাখির যখন বয়স হয় তখন তার নখ আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যায়, তার ডানার পালক আস্তে আস্তে খসে যেতে শুরু করে, নতুন পালক এর জন্য। তখন ঈগল পাখিটা ১৫০ দিনের জন্য কোন একটা নির্জন গুহায় আশ্রয় নেয় নিজেকে আবার নতুন ভাবে তৈরি করার জন্য। ঠিক ১৫০ দিনের মধ্যে তার নতুন পালক, আর নতুন নখ গজায় আবার নতুন করে বাঁচা শুরু হয়। কিন্তু এই ১৫০ দিন সে তার সাথে যুদ্ধ করে, অসহ্য যন্ত্রনায় সে মৃত প্রায় হয়ে যায়। কিন্তু সব যন্ত্রনার পর সে তার আগে রুপে ফিরে আসে।
এই গল্পটা পড়ার পর আমি ১৫০ দিন মানে ৫ মাস ( আমি ৬ মাস ধরেছিলাম) এর জন্য নিজেকে ঠিক করে ফেলি। তখনই সিধান্ত নেই আজ থেকে ডায়েট করবো, এই মুহূর্ত থেকেই করবো। শুরু করে দিলাম। প্রথম একজন এর সাথে পরিচয় ছিলো যিনি আমাকে দুটা জিনিস নিষিদ্ধ করেছিল। সুগার এবং কার্বোহাইড্রেট। এর মধ্যে ভাত ও ভাত জাতীয় সব কিছু পরে, আটা ময়দাও পরে ( সরল কার্বোহাইড্রেট ) তাহলে খাবো কি! ঠিক এই সময় আমার এক বান্ধবী ( হয়তো এই গ্রুপে আছে) আমাকে ওটস খাওয়ার জন্য বলে। ভাতের পরিবর্তে ( তখন এই গ্রুপে ছিলাম না) , শুরু করলাম। চলছে এভাবে। ১ সপ্তাহ পরে প্রথম ভাত খেলাম দুপুরে। এভাবে চলতে চলতে ১৫ দিন পর একবার, তারপর ১ মাসে একবার, তারপর দুই মাসে একবার। অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে তাহলে কি খেয়ে বাচলাম? ফল ছিলো আমার সবচেয় অপছন্দের খাদ্য, বাধ্য হয়ে তখন তাই খেলাম, কিন্তু ফল যে এত মজা তখনি তা বুঝতে পারলাম। যাই হোক এভাবে চলতে থাকলো। ডায়েটে থাকি বলে আত্মীয়দের বাসায় যেতাম না কারন গেলেই তারা খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাবে। বাদ দিয়ে দিলাম বেরাতে যাওয়া, বন্ধুদের আড্ডা যেতাম কম, কারন গেলেই খাওয়া দাওয়া তাও খুব অপছন্দের ( আগে খুব পছন্দের ছিলো) জিনিস ভাজাপোড়া। বন্ধুমহল হচ্ছে সয়তানের আখড়া, যখন দেখলো আমি ডায়েট করি তখন তারা আমাকে সব ধরনের যা যা আগে পছন্দ করতাম সব খাবার ট্রীট দিতো, অথচ আমি তাদের সাথে এক টেবিলে বসেও শুধু শশা খেতাম। মাঝে মাঝে তাদের সাথে যেতামও না। এমন অনেক ট্রিট, অনেক আপ্যায়ন আমি সামনে বসে থেকেও ছুয়ে পর্যন্ত দেখি নাই। সবাই অবাক হয়ে যেতো।
আম্মু খুব রাগা রাগি করতো। বাসায় বিশেষ দিনেও আমি ওটসই খেতাম। আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার ছিলো বিরিয়ানি। যা দেখলে আমি সব ভুলে যাই। সেই খাবারটাও আমি খুব হাসি মুখেই বিদায় জানিয়েছি। আমার কাছে তখন এগুলা বিষ মনে হতো। তখন আমার পাশে এমন কেউ ছিলো না যাকে ক্যালোরি কিংবা ফ্যাট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে কি কি খাওয়া যাবে পরামর্শ নেয়ার। যাই হক, গুগল আর বিভিন্ন ব্লগ থেকে উপাত্ত নিয়ে ওগুলাই ফলো করতাম।
এভাবে তিন মাস হয়ে গেলো রেজাল্ট বলতে শুন্য। দেখা গেলো ওজন মাত্র ২ কেজি কমছে। ১১৮ কেজি। তখন খুব হতাশায় পরলাম। প্রতিদিন ১ ঘন্টা করে ব্যায়াম করে এই ফলাফল! খুবই হতাশ। নিজের ভুরি দেখে গেলো মেজাজটা আরও বেশি খারাপ হয়ে। মনে হলো তখনি ভুরিকে কিল ঘুসি মারি। ওজন যন্ত্র ভেঙ্গে ফেলি। পরক্ষনেই ভাবলাম তিন মাসে যদি ২ কেজি কমে তাহলে ৬ মাসে ৪ কেজি। তাহলে ৭৫ কেজি তে আসতে লাগবে ২ বছর। মন পরিবর্তন করে ফেললাম। হতাশ হওয়া চলবে না। সময় বারিয়ে দিলাম। কিন্তু সময় নিয়ে চিন্তা করতাম না। মাথায় রাখতাম আজকের কাজ আজকেই করবো, কাল কি হবে সেটা কালকেই চিন্তা করবো। ওজন কমাতে হবে যেকনো ভাবে। ইনশাল্লাহ আমি পারবো।
ঠাণ্ডা পানি খাওয়া ছেড়ে দিলাম ( সফট ড্রিঙ্কস আগেই ছেড়ে দিসিলাম), প্রচণ্ড গরমের মাঝেও ঠাণ্ডা পানি স্পর্স করলাম না। রোজা এসে গেলো। কিভাবে সেহরি করবো? কিভাবে ইফতার? তেমন পরিবর্তন আনলাম না চ্যার্টে, প্রথম রোজার সেহরি তে ভাত খেলাম, ইফতার করলাম ভাজা পোড়া দিয়ে। এর মধ্যে গরম তারপরেও ঠাণ্ডা পানি স্পর্শ করলাম না। রোজার মধ্যে গেলাম বন্ধুদের সাথে নামায পড়তে সেখানেও তাদের খোঁচাখচি শুরু করলো আমাকে নিয়ে হাসাহাসি, তবে এই বার অন্যভাবে। কিছু বললাম না। মনে মনে দিনটা মনে রেখে দিলাম। যাইহক ঈদ আসলো। সম্ভবত ঈদের দিন কিছু খেলাম। মিষ্টি খেলাম না। কেবল ঈদের দিন হাল্কা পাতলা ভারি খাবার খেলাম। পরদিন থেকে শুরু হলো আবার ডায়েট। এভাবে টানা চললও কুরবানি পর্যন্ত। কুরবানির ঈদ- মনে আছে মাত্র ৩ টুকরা গরুর মাংস খেলাম ঈদের দিন তাও ওটস দিয়ে। তারপর পরের ১৫ দিনে ১০ টুকরা গরুর মাংস খাওয়া হলো।
খুব সম্ভবত আমি তখন ৮৫ কেজি তে। অবাক হয়ে গেলাম। আল্লাহ মেহেরবান অসীম দয়ালু, ও করুনাময়। এতটা কমবে বুঝতে পারি নাই। তখন প্রায় ৬ মাসের কাছাকাছি। পরে বুঝতে পারলাম। ঠাণ্ডা পানিটা আমার অনেক ক্ষতি করলো। তখন মোটামুটি কিছুটা আস্তে আস্তে সাভাবিক হতে শুরু করলাম। খাদ্যের প্রতি অনেক অভিজ্ঞতা হচ্ছে তখন। অনেক অভ্যস পরিবর্তন হয়ে গেলো। ভাত খাওয়ার প্রবণতা একদম নাই। রাত ৮ টার মধ্যেই ডিনার শেষ করা ইত্যদি। বাসা থেকেও তেমন কিছু বলেনা এখন। ১১ মাসে আমি গড় হিসাব করলে ১৫ দিনের মত ব্যায়াম করি নাই। শরীর ঠিক রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম অপরিহার্য।
আশ্চর্যের বিষয় এটাই রাস্তায় এখন বের হলে আমাকে কেও চিনতে পারে না। নিজের এই পরিবর্তনে আমি কখনো অহংকারবোধ করি নাই, এখনো না। যারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত তারা এখন আমার সামনে আমার গুণগান গাইলে তাদের মানা করি। তাদের প্রতি আমার কোনো আক্ষেপ নাই যারা আমাকে নিয়ে যত বাজে মন্তব্য করতো। বরং তাদের কাছে আমি ঋনি কারন, তারা আমাকে সঠিকভাবে মুল্যায়ন করতে পেরেছে। তাদের মন্তব্য আমাকে রাস্তা দেখিয়েছে।
তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, যারা ডায়েট শুরু করছেন বা করবেন করবেন ভাবছেন। সবার আগে হতাশ হওয়া থেকে বিরত থাকুন। সঠিক ভাবে নিয়ম মেনে ডায়েট করলে ওজন কমবেই যে ডায়েট চার্ট ফলো করেন না কেনো। যাই করবেন সেটার যেনো একটা নির্দিস্ট সময় থাকে এবং সে সময়ের আগে কোনো ভাবেই তা ব্রেক করবেন না। মনের উপর জোর খাটান। মন এর উপর নিজের আয়ত্ত নিয়ে আসুন। একবার কোনো ভাবে ৩ মাস অতিক্রম করেন, বাকিটা ইতিহাস হয়ে যাবে। ইনশাল্লাহ।
আমার পরিবর্তন কেবল আমার জন্যই। নিজের জন্য নিজেকে পরিবর্তন করুন, অন্য কারো জন্য নয়।
লেখায় কোনো ভুল থাকলে খমার দৃষ্টি তে দেখবেন। সমালোচনা পছন্দ করি, সমালোচনা করতে পারেন।
শুভকামনা রইলো সবার জন্য।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
51

পাঠকের মতামতঃ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here