ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং: কিটোর বিকল্প

0
6359

সেইম ডায়েট ফলো করেও অমুক ভাইয়ের তো মাসে ৫ কেজি কমল কিন্তু আমার তো ২ কেজির বেশী কমে না। অনেকেই বলে ভাইয়া শুকায়ে গেছি কিন্তু ওজন ধরে রাখতে চাই। কিভাবে কি করব এখন?
আপনি যদি এই দুই দলের কেউ হয়ে থাকেন তবে আজকের পোস্ট আপনার জন্যই।
কিটোর জ্বালায় যখন সবাই দিশেহারা তখন এর বিকল্প ডায়েটের খোজে অনেকেই বেছে নিয়েছেন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কে। এই ডায়েট সম্পর্কে খুব কম মানুষ ই জানেন। সুতরাং আজকে আমি সেটা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলব। এই ডায়েট সিস্টেম আপনার ওজন কমার গতিবেগ বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে। লেখা অনেক বড় হবে তাই সময় নিয়ে পড়বেন।
শুরুতে আসি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি?
সোজা বাংলায় বললে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উপোস থাকার আরেক নাম ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং। এটা কিন্তু কোন ডায়েটিং এর মধ্যে পড়ে না। এটি হল এক ধরনের খাদ্যাভ্যাস যা আপনার ওজন কমাবে।
কখন থেকে শুরু হয়েছে এই সিস্টেম?
অনেকেই ভাবতেসেন এইটা মে বি নিউ আইডিয়া। এই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং(IF) শুরু হয়েছে প্রথম সম্ভবত হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সময় থেকে। এই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই সিস্টেম চলে আসছে যাকে আমরা মুসলমানরা বলি রোজা, হিন্দুরা বলে উপোস। বৌদ্ধরাও এটা করে তবে তারা এটাকে কি নামে ডাকে সেটা জানি না। কিন্তু আমরা যে ইন্টারমিটেন্ট করব সেখানে খাবার পুরাপুরি বন্ধ থাকবে না। পানি, চা, কফি, স্যালাইন ইত্যাদি হালকা খাবার খাওয়া যাবে।
কেন এটাকে কিটোর বিকল্প বলেছি?
– কিটোতে যেভাবে দেহের বিকল্প জ্বালানী ব্যবহার করা হয় ঠিক তেমনি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এও নির্দিষ্ট সময় পর কিটোন বডি জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার হয়। খাবার নির্দিষ্ট সময় পর আমাদের দেহে গ্লুকোজ যখন শেষ হয়ে যায় তখন বডি ফ্যাট ভেংগে কিটোন বডি প্রস্তুত করে। অর্থাৎ যেই লাউউ সেই কদু। মাঝখান দিয়া ফাস্টিং এর কোন সাইড ইফেক্ট নাই। নিশ্চিন্ত মনে করতে পারবেন। কিটো ডায়েটের খারাপ দিকগুলা জানতে হলে গ্রুপের ফাইলগুলি চেক করেন।
কিভাবে করব ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং?
প্রায় ৬ টি ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে করা যায় এই ফাস্টিং। আমি শুধু পপুলার এবং বাঙালীদের জন্য উপযোগীগুলা তুলে ধরছি-
উপায় ১
১৬/৮ ঘন্টা সিস্টেম: মার্টিন বেরখান নামক পুষ্টিবিদ এই সিস্টেম আবিষ্কার করেছেন। এই সিস্টেমে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আপনি ১৬ ঘন্টা উপোস থাকবেন এবং বাকি ৮ ঘন্টার মধ্যে খাওয়া দাওয়া করবেন। শুনেই ভয় লাগছে? আরে ১৬ ঘন্টার মধ্যে ৯ ঘন্টা তো আপনি ঘুমেই থাকবেন। উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। যেমন আপনি সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া করবেন। বিকাল ৪ টা থেকে পরদিন সকাল ৮ টা পর্যন্ত না খেয়ে থাকবেন। একদম সহজ।
খাবারের ৮ ঘন্টায় কি খাবেন?
-১২০০ কিলোক্যালরির খাবার। (একসাথে ১২০০ কিলোর খাবার কিন্তু কম না)
কয়বার খাবেন?
-আচ্ছামত। একবার, দুইবার, তিনবার যতবার খুশি।
ভাইয়া চার্ট দেন?
– কোন চার্ট নাই। ১২০০ হিসেব করে যা মন চাবে তাই খাবেন।
কারা করবেন এই সিস্টেম?
-কর্মজীবী মহিলারা, ৩০ এর বেশি বয়সের মোটা মানুষ।
উপায় ২
One Meal A Day (OMAD)
এইটা আমার কাছে সর্বাপেক্ষা ভাল উপায় মনে হয়েছে। খুবই সহজ উপায়। দিনে মাত্র একবেলা খাবেন। সেটা তাও সকাল বেলা। পেট ভরে খাবেন। প্রোটিন একটু বেশি খাবার চেষ্টা করবেন। এই সিস্টেম ফলো করে আমি নিজে ৩ মাসে ২০ কেজির মত ওজন কমিয়েছি। OMAD নিয়ে আমার বিস্তারিত পোস্ট করার ইচ্ছা আছে।
কি খাবেন?
-এক বেলা খায়া ধ্বংস করে ফালাইবেন। দেখা যাবে কে কত কুপাইতে পারেন।
কারা করবেন?
-শক্ত মানসিকতার লোকজন করবেন এটা। এটা অবশ্যই মোটা মানুষদের জন্য।
এতক্ষন তো শুধু মোটাদের জন্যই বলে গেলাম। যারা মেইন্টেইন করবে তাদের জন্য কি কিছু নাই?
উপায় ৩
৫:২ ডায়েট: বৃটিশ ডাঃ মাইকেল মোসলে এই সিস্টেমের চালু করেছেন। এই সিস্টেমে আপনি সপ্তাহে ৭ দিনের মধ্যে ৫ দিন স্বাভাবিক খাবার খাবেন এবং বাকি ২ দিন ৫০০-৬০০ কিলোর খাবার খাবেন।
কারা করবেন?
-যারা আর শুকাতে চান না, শুধু ওজন মেইন্টেইন করতে চান শুধুমাত্র তারাই এটা করবেন। আমি বলে দিচ্ছি মটুরা এই ডায়েট ফলো করলে শুকাবেন না।
উপায় ৪
সপ্তাহে ২ দিন পুরাপুরি না খেয়ে থাকবেন বাকি ৫ দিন স্বাভাবিক খাবার। উদাহরণ দিয়া সহজ করি। মনে করেন আপনি পানি, চা, কফি বাদে রবিবার আর বুধবার কোন খাবার খাবেন না। বাকি দিন গুলাতে স্বাভাবিক খাবার খাবেন।
কারা করবেন?
-যারা ওজন মেইনটেন করতে চান শুধু তারা। মটুরা দূরে থাকেন।
কেন করবেন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-
১. কোন সাইড ইফেক্ট নাই। কিছু মানুষের দুর্বলতা দেখা দেয় প্রথম কয়েকদিন, পড়ে তা ঠিক হয়ে যায়।
২. ইহা মানুষের কোলেস্টেরল লেভেল কমায় (মনে রাখবেন কিটো কোলেস্টেরল বাড়ায়)। যার ফলে হার্টের রোগের সম্ভাবনা কমে যায়।
৩. এই সিস্টেম ব্লাডে ইনসুলিন এর পরিমাণ কমায়। ফলে ডায়েবেটিস এর ঝুকি কমে যায়। ডায়েবেটিস রোগীদের জন্যও এই সিস্টেম উপযোগী।
৪. এটি গ্রোথ হরমোন রিলিজ ৫ গুন বৃদ্ধি করে। ভাইয়া/আপুরা ভেবে দেখছেন ৫ গুন বেশি। যা কিনা আপনার ওজন কমানোকে বহুগুনে ত্বরান্বিত করে। যারা ওজন কমাতে গ্রোথ হরমোনের প্রভাব কি জানেন না তারা গ্রুপের ফাইল গুলা চেক করে দেখে নিবেন।
৫. ইহা মেটাবলিজমকে ১৪ গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে বুঝতেই পারতেছেন পুরাই 3G স্পীডে ওজন কমবে।
৬.সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেসে, ফাস্টিং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করে দেয়।
এমন আরও অনেক উপকার আছে যা লেখার জায়গা নেই। এবার জেনে নেই কারা কারা এই ফাস্টিং করতে পারবেন না-
১. ১৮ বছরের কম এবং ৫০ বছরের বেশি লোকজন।
২. গর্ভবতী এবং স্তন্যদানকারী মহিলা।
৩. খুব খারাপ ধরনের গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যা আছে যাদের। (পেপটিক আলসার)
ডায়েবেটিস টাইপ-২, হাইপ্রেশার, হার্টের রোগীরাও এই সিস্টেম ফলো করতে পারেন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী করা উত্তম।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এর উপোস চলাকালীন সময়ে চা, কফি, পান, স্যালাইন, ওষুধ খেতে পারবেন। আর খাবার এর সময় শাকসবজি, ফলমূল, পুষ্টিকর খাদ্য খাবেন। যারা ২ মাসের বেশি করতে চান তাদেরকে ডাক্তাররা মাল্টিভিটামিন খেতে বলেন। এই সময় প্রচুর পানি পান করবেন। দিনে হিসাব করে ৫ লিটার পানি খাবেন।
যারা মনস্থির করে ফেলেছেন যে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করবেন তারা শুরুতে ব্যায়াম করবেন হালকা করে। সময়ের সাথে সাথে ব্যায়ামের পরিমান বাড়াবেন। আর যদি কারও ব্যায়াম করতে ক্লান্তি/দুর্বল লাগে তবে করার দরকার নাই। কেননা ব্যায়াম ছাড়াই ইন্টারমিটেন্ট আপনার চর্বির বারোটা বাজাতে সক্ষম।
আমার লেখাগুলি বিভিন্ন বই, ব্লগ, লেকচার, রিসার্চ পেপার থেকে নেয়া। আমি শুধুমাত্র সেগুলিকে সহজ ভাষায় আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। কোন ভুল থাকলে ক্ষমার চোখে দেখবেন। কোন কিছু না বুঝলে বা জানতে চাইলে কমেন্ট করতে পারেন। সময় পেলে আমি অবশ্যই উত্তর দেবার চেষ্টা করব।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
321

পাঠকের মতামতঃ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here